হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভেড়ামারায় অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব: প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
হেলাল মজুমদার কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে মহামান্য হাইকোর্টের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তব চিত্রে তার কোনো প্রতিফলন মিলছে না। বালি খেকো চক্রকে দমনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল একটি লাল রঙের সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টাঙিয়েই ‘দায়সারা’ দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাঠ পর্যায়ে কঠোর কোনো তদারকি বা নিয়মিত অভিযান না থাকায় এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসবা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেড়ামারার সংশ্লিষ্ট এলাকায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিট পিটিশনের (নং ৭০৩০/২০২০) আদেশের বরাত দিয়ে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। যাতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং অবৈধভাবে বালু পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি এই আদেশ অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং লঙ্ঘনকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, এই সাইনবোর্ড কেবলই একটি শোভাবর্ধনকারী বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কারণ প্রশাসনের নজরদারির অভাবে প্রভাবশালী বালু দস্যুরা আদালতের এই নিষেধাজ্ঞাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না। প্রতিদিন শত শত ট্রলি ও ড্রাম ট্রাকে করে অবৈধভাবে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন নদীর তীরবর্তী এলাকা মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে ভারী যানবাহনের দাপটে গ্রামীণ রাস্তাঘাটও ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
আকমল হোসেন (৫০), স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা বলেন, প্রশাসন শুধু নদীর পাড়ে একটা লাল সাইনবোর্ড টাঙিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ মনে করছে। দিনে-দুপুরে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে শয়ে শয়ে ট্রাক ও ট্রলি বালু নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে থাকলে তো আর বালু দস্যুদের আটকানো যাবে না। এটা প্রশাসনের লোক দেখানো কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়।
নুরুল ইসলাম (৪৫), স্থানীয় কৃষক বলেন, পদ্মা নদী থেকে প্রতিনিয়ত এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বালু কাটার ফলে আমাদের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি তীব্র নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বালুর ভারী গাড়ি চলাচলের কারণে এলাকার কাঁচা-পাকা সব রাস্তাও ভেঙে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। আমরা বারবার অভিযোগ জানালেও প্রশাসনিক কোনো অভিযান আমরা দেখতে পাই না।
রহিম শেখ (৩৮), পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা নাকি দণ্ডনীয় অপরাধ, সাইনবোর্ডে তো তাই লেখা! কিন্তু বাস্তবে দেখছি আইন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য, বালু খেকোদের জন্য নয়। পুলিশ বা প্রশাসনের যদি সত্যি ইচ্ছা থাকত, তবে এই অবৈধ কারবার একদিনও চলতে পারত না। আমরা দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিরুল আরাফাত বলেন, আমি বিষয়টা জানতে পেরেছি আমি বিষয়টা দেখতেছি।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন বলেন, আমি এখন ছুটিতে আছি এ বিষয়ে কথা বলতে পারছিনা।
পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলের মতে, এভাবে শুধু সতর্কবার্তা জারি করে বসে থাকলে দেশের নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই ‘দায়সারা’ ভূমিকা নদী ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।