ঢাকা ০৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
যশোরের লালদীঘিতে ভক্তদের অশ্রুসিক্ত বিদায় আসছে বছরের অপেক্ষা, নৌকায় চড়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা জমি লিখে না দেওয়ায় হাসপাতালে নিতে বাধা অসুস্থ বাবাকে সিরাজগঞ্জ আদালতের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ভেড়ামারায় গ্রেপ্তার ৬ ছেলের ঘরেও আশ্রয় হলো না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুর রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বড় প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহীতে ৩৮,৯৭০ আঁখ চাষীকে আর্থিক প্রনোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে শান্তির দেশে পরিণত করতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর সৌদিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক নজরুলের মৃ’ত্যু’দ’ণ্ড কার্যকর, বাড়িতে শোকের মাতম প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী আগমন উপলক্ষে ছাত্রদলের স্বাগত মিছিল সাংবাদিক জহিরুলের মামলা প্রত্যাহার ও আলিফ ফকির হত্যার বিচারের দাবিতে শ্রীপুরে মানববন্ধন মো: আব্দুল বাতেন বাচ্চু,

যশোরের লালদীঘিতে ভক্তদের অশ্রুসিক্ত বিদায় আসছে বছরের অপেক্ষা, নৌকায় চড়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা

যশোর প্রতিনিধি: টানা ছয় দিনের পূজা-অর্চনা ও উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। এর মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটেছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল থেকে যশোরের বিভিন্ন স্থানে ভক্তদের উপস্থিতিতে একের পর এক প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। শহরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘির পুকুরপাড়ে দেবীকে বিদায় জানাতে সমবেত হন হাজারো ভক্ত। আনন্দের উৎসব শেষে বিদায়ের বেদনায় আবেগঘন হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।

দুপুর থেকেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যে যশোর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে শোভাযাত্রা করে প্রতিমাগুলো আনা হয় লালদীঘির পাড়ে। পরে নৌকাযোগে পুকুরের মাঝখানে নিয়ে একে একে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা।

দেবীর বিদায়ে লালদীঘির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় বেদনাবিধুর পরিবেশ। মেয়ের বিদায়ে বাবার বাড়ির প্রতিটি কোণ যেমন শূন্যতায় ছেয়ে যায়, বিজয়া দশমীতে লালদীঘির ঘাটেও যেন তেমনই বিষাদের ছায়া। কারও চোখে অশ্রু, কারও ঠোঁটে দেবীর বন্দনা। শেষ মুহূর্তে ভক্তরা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনায়। কেউ কেউ পুকুরের জল নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শরীরে ছিটিয়ে নেন।

রাজারহাট থেকে আসা তন্দ্রা রায় বলেন, এই কয়েকটা দিন মা দুর্গা আমাদের মাঝে ছিলেন, তাই চারপাশ আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু আজ মা চলে যাচ্ছেন, সেই কষ্টে বুকটা ভারী হয়ে উঠেছে। আবারও এক বছর মায়ের আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকরা জানান, অশুভ শক্তির বিনাশ ও মানুষের মঙ্গলের জন্য দেবী দুর্গার আগমন। তারা দেবীর কাছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রার্থনা করেন, যাতে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। দেশ থেকে অন্যায়-অপরাধ দূর হোক, আগামী দিনে দেশ সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক এবং সব মানুষের মঙ্গল হোক, এমন প্রত্যাশা তাদের।

পুরোহিতদের শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন করছেন নৌকায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোড়ায় আগমনকে অস্থিতিশীলতা ও ছত্রভঙ্গ পরিস্থিতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে দেবী দুর্গা স্বামীর বাড়ি কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে পিতৃগৃহে আসেন। পাঁচ দিন ধরে ভক্তরা দেবীর বন্দনা, পূজা ও উৎসবে মেতে ওঠেন। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হলেও অন্তরে থেকে যায় আগামী বছর তাঁর পুনরাগমনের প্রত্যাশা।

দশমীর সকালে মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজার অন্যতম প্রধান আচারে অংশ নেন নারীরা। দেবী দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে তাঁরা তাঁর শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে একে অপরের গায়ে সিঁদুর মেখে জীবনের সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করেন।

এদিকে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে যশোরের বিভিন্ন মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। শোভাযাত্রায় পুলিশের বিশেষ দল, বিজিবি, এসআরবি-৬, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যসহ জেলা পুলিশের কয়েকশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেন।

দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আনন্দ ও বিদায়ের বেদনা পেরিয়ে এখন ভক্তদের অপেক্ষা, আরও একটি শরতে আবারও মর্ত্যে আসবেন মা দুর্গা।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

যশোরের লালদীঘিতে ভক্তদের অশ্রুসিক্ত বিদায় আসছে বছরের অপেক্ষা, নৌকায় চড়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা

যশোরের লালদীঘিতে ভক্তদের অশ্রুসিক্ত বিদায় আসছে বছরের অপেক্ষা, নৌকায় চড়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা

আপডেট টাইম : ০৯:২৭:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

যশোর প্রতিনিধি: টানা ছয় দিনের পূজা-অর্চনা ও উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। এর মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটেছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল থেকে যশোরের বিভিন্ন স্থানে ভক্তদের উপস্থিতিতে একের পর এক প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। শহরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘির পুকুরপাড়ে দেবীকে বিদায় জানাতে সমবেত হন হাজারো ভক্ত। আনন্দের উৎসব শেষে বিদায়ের বেদনায় আবেগঘন হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।

দুপুর থেকেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যে যশোর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে শোভাযাত্রা করে প্রতিমাগুলো আনা হয় লালদীঘির পাড়ে। পরে নৌকাযোগে পুকুরের মাঝখানে নিয়ে একে একে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা।

দেবীর বিদায়ে লালদীঘির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় বেদনাবিধুর পরিবেশ। মেয়ের বিদায়ে বাবার বাড়ির প্রতিটি কোণ যেমন শূন্যতায় ছেয়ে যায়, বিজয়া দশমীতে লালদীঘির ঘাটেও যেন তেমনই বিষাদের ছায়া। কারও চোখে অশ্রু, কারও ঠোঁটে দেবীর বন্দনা। শেষ মুহূর্তে ভক্তরা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনায়। কেউ কেউ পুকুরের জল নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শরীরে ছিটিয়ে নেন।

রাজারহাট থেকে আসা তন্দ্রা রায় বলেন, এই কয়েকটা দিন মা দুর্গা আমাদের মাঝে ছিলেন, তাই চারপাশ আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু আজ মা চলে যাচ্ছেন, সেই কষ্টে বুকটা ভারী হয়ে উঠেছে। আবারও এক বছর মায়ের আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকরা জানান, অশুভ শক্তির বিনাশ ও মানুষের মঙ্গলের জন্য দেবী দুর্গার আগমন। তারা দেবীর কাছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রার্থনা করেন, যাতে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। দেশ থেকে অন্যায়-অপরাধ দূর হোক, আগামী দিনে দেশ সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক এবং সব মানুষের মঙ্গল হোক, এমন প্রত্যাশা তাদের।

পুরোহিতদের শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন করছেন নৌকায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোড়ায় আগমনকে অস্থিতিশীলতা ও ছত্রভঙ্গ পরিস্থিতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে দেবী দুর্গা স্বামীর বাড়ি কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে পিতৃগৃহে আসেন। পাঁচ দিন ধরে ভক্তরা দেবীর বন্দনা, পূজা ও উৎসবে মেতে ওঠেন। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হলেও অন্তরে থেকে যায় আগামী বছর তাঁর পুনরাগমনের প্রত্যাশা।

দশমীর সকালে মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজার অন্যতম প্রধান আচারে অংশ নেন নারীরা। দেবী দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে তাঁরা তাঁর শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে একে অপরের গায়ে সিঁদুর মেখে জীবনের সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করেন।

এদিকে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে যশোরের বিভিন্ন মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। শোভাযাত্রায় পুলিশের বিশেষ দল, বিজিবি, এসআরবি-৬, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যসহ জেলা পুলিশের কয়েকশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেন।

দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আনন্দ ও বিদায়ের বেদনা পেরিয়ে এখন ভক্তদের অপেক্ষা, আরও একটি শরতে আবারও মর্ত্যে আসবেন মা দুর্গা।