বাগমারায় আওয়ামী লীগের সাথে আতাত করে গ্রাম পুলিশ নিয়োগের চেষ্টা
রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটসহ স্বেচ্ছাচারিতার মত গুরুত্বর অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) বিরুদ্ধে। তবে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে খোদ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রের বরাতে। গ্রাম পুলিশ (মহল্লাদার/দফাদার) নিয়োগ থেকে শুরু করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাগমারা উপজেলার ৪ নং বড়বিহানালী ইউনিয়নে গ্রাম পুলিশ সংকট দেখা দিলে গত ১৭ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান মিলন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর দুইজন গ্রাম পুলিশ নিয়োগের লিখিত চাহিদাপত্র প্রদান করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ মে ২০২৪ তারিখে ইউএনও মোঃ মাহবুবুল ইসলাম একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও তৎকালীন সময় নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তীতে আরও একজন গ্রাম পুলিশের মৃত্যু হলে ০৪ জুন ২০২৫ তারিখে পুনরায় তিনজন গ্রাম পুলিশের চাহিদাপত্র প্রদান করা হয়। এর আলোকে ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে আবারও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন ইউএনও। এবারও একই রাজনৈতিক (আওয়ামী লীগ) প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগ তোলেন বড়বিহানালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান। এছাড়াও নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিন নিয়োগ কমিটির সদস্য ও কাচারি কুয়ালীপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে দেনদরবারে জড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়। এমন অভিযোগ তুলে অভিযোগকারি চেয়ারম্যান তার নিজস্ব ফেসবুক আইডি তে একটি পোষ্ট দেন। সেখানে তিনি গ্রাম পুলিশ নিয়োগে টেবিল মানির কথা তুলে ধরেন এবং প্রশ্ন তোলেন “সাংবাদিকরা চুপ কেন?”। চেয়ারম্যান ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুললে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গ্রাম পুলিশ নিয়োগের নামে ইউএনও মোঃ মাহবুবুল ইসলাম তার থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নিয়োগ না হওয়ায় গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ১০ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা ফেরত পেয়েছেন বলে জানান।
পরে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ স্থগিতের একটি অফিসিয়াল আদেশ উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয় থেকে জারি করা হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। তবে প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা জানান, ইউএনওর নির্দেশেই নিয়োগ কার্যক্রমটি স্থগিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ইউএনওর কাছে পৌঁছানোর পর এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এমন অভিযোগের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উক্ত নিয়োগ কমিটিতে দুইজন জনপ্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে। তারা হলেন ৮ নং কাচারী কুয়ালীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক ও ৯ নং শুভডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন। এরমধ্যে মোজাম্মেল হক কাচারি কুয়ালীপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। অপরদিকে মোশাররফ হোসেন বিএনপির রাজনীতি করলেও হাসিনা সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সাথে আতাত করে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন।
শুধু নিয়োগ নয়, বাগমারায় একটি সরকারি পুকুর সংস্কার প্রকল্পের নামে সরকারি টাকার তসরূপ করা হয়েছে। একটি পুকুরকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কুচুরিপানা পরিষ্কারের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। অথচ বাস্তবে ৫–১০ হাজার টাকাতেই এই কাজ করা সম্ভব ছিল। এই কাজটি করেছেন ইউএনও মনোনীত একজন তথাকথিত সমন্বয়ক। কাজ করা সেই সমন্বয়কের সাথে কথা হয়েছে প্রতিবেদকের। যার কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও পুকুর চারপাশে ৩৬০ মিটার প্রটেকশন / গার্ড ওয়াল নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৫ লক্ষ টাকা। কাজটি করেছে “মেসার্স কথা এন্টার প্রাইজ”। পুকুর চারপাশে সিসি রাস্তা নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৮ লক্ষ টাকা। কাজটি করেছেন “ভাই ভাই কন্সস্ট্রাকশন”। পুকুরের পাড়ের এক পাশ সিমেন্টব্লক বসানো হয়েছে ২৭ লক্ষ টাকার। কাজটি করেছেন মেসার্স জায়েদা কন্সস্ট্রাকশন। পুকুরের চারপশে মাটি ফেলানো জন্য বরাদ্দ হয় ৫ লক্ষ টাকা। কাজটি করেছে স্থানীয় একটি প্রেসক্লাব। এছাড়াও পুকুরের চারপাশ ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন, উপজেলার ভিতরে শিশুদের জন্য খেলার সরঞ্জাম, সানবাঁধা ঘাট নির্মাণেও আরও মোটা অংকের টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অবশ্য এই প্রকল্পগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই সকল তথ্য চাইতে গেলেই পড়তে হচ্ছে বিপাকে। তথ্য চাইলেই সবার মুখে কুলুপ দিয়ে বসছেন। এই তথ্য টুকু পেতেই প্রতিবেদকের ঘাম ঝরেছে।
গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর উক্ত আসনের সাংসদ ও উপজেলা প্রতিনিধি শূন্যতার সুযোগে টিআর, কাবিখা, গর্ভবতী ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাত থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। অনুসন্ধানীভাবে যাচাই করলে এসব খাতের বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য উঠে আসবে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।
এই সকল অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গেলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাহবুবুল ইসলাম প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং কোনো ধরনের তথ্য সহায়তা প্রদান করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং তাকে অফিস ত্যাগ করতে বলা হয়ছে বলে প্রতিবেদকের দাবি। এমন রেকর্ডও প্রতিবেদকের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে।
বি:দ্র: এই প্রতিবেদনটি একটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সিরিজের অংশ। বাগমারা উপজেলায় নিয়োগ বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক লুটপাটের প্রতিটি অভিযোগ পর্যায়ক্রমে তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা হবে।