শ্রী সুন্দরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়: জাতীয়করণ প্রাণের দাবি
লালপুর (নাটোর)প্রতিনিধি :
নাটোরের লালপুরে পদ্মা বিধৌত অববাহিকায় ১৮২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পাঠশালা। বর্তমান নওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত। এরপর পুঠিয়ার মহারানী ১৮৬৭ সালে শিক্ষা বিস্তারের সুতিকাগার ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যা ১৯৩৫ সালের ৬ মে ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ এবং ১৯৪১ সালে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামকরণ করে কলিকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন মুঞ্জরী পায়।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস :
প্রমত্তা পদ্মার নৈসর্গিক বেলাভূমি, শস্যে ভরা প্রান্তর ও জনকোলাহলময় এক জনপদে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে ‘লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’।
বিভিন্ন দলিল ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, স্থানীয় ভূস্বমী ও শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে লালপুরে ১৮২২ সালের দিকে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময় ইংরেজরা বিদ্যালয়টি পুড়িয়ে দেয়। সে সময় এখানে মুন্সেফ চৌকি, সাব-রেজিস্টার অফিস প্রভৃতি ছিল। পরে পুঠিয়ার মহারাণীর অনুদানে নিজ নামে ১৮৬৭ সালে ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
দুর্দিনে পতিত হয়ে স্কুল বন্ধ :
পুঠিয়া রাজবংশের ‘পাঁচআনি’ শাখার বড় তরফের রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারাণী শরৎ সুন্দরী দেবী, এরপর তাঁদের ছেলে যতীন্দ্র নারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারাণী হেমন্ত কুমারী দেবী জমিদারীর লাভ করেন। বিদ্যালয়টি ১৯৩১ সালে আগুনে পুড়ে যায় এবং রাজকোষ থেকে অনুদান না দেওয়ায় ১৯৩৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি স্কুল:
স্থানীয় বুধপাড়ার জমিদার যতীন্দ্রনাথ কুন্ডু ও দেবেন্দ্রনাধ কুন্ডু তাঁদের পিতার নামে ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামকরণ করে পরিচালনার উদ্যোগ নেন। যা ১৯৩৫ সালের ৬ মে ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ২৫ জন ছাত্র নিয়ে পাঠদান শুরু হয়।
শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়:
এরপর ১৯৪১ সালে জমিদার বাবু দেবেন্দ্র নাথ কুন্ডুর স্ত্রীর নামে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামকরণ করে কলিকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন মুঞ্জরী পেলে ১৯৪৫ সালে শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন।
অব্যাহত এগিয়ে চলা :
সমাজ হিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী দেবেন্দ্রনাথ কুন্ডু, জোতিন্দ্রনাথ কুন্ডু, শিবপ্রসাদ আগরওয়লা, সতীশ চন্দ্র সরকার, জমির সেখ, উমির সেখ, সৌদামিনা দাস, ননীবালা দাস, কৃষ্ণপদ সরকার, তারাপদ সরকার, যতীন্দ্রনাথ সরকার, মোছা. মাহেদা খাতুন, আফসার আলী মন্ডল, মো. আকবর আলী মালিথা প্রমুখ স্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলে।
সরকারি সহায়তা :
পূর্বপাকিস্তান সরকারের সরবরাহ সচিব সৈয়দ মুহাম্মদ আফজাল ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন বিদ্যালয়ের মুল ভবনের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার ‘দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী’ পরিকল্পনা উন্নয়নে অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে বিদ্যালয়টি পাইলট স্কীমভূক্ত ও ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি অনুদান পায়। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৯৬ সালে এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ২০০১ সালে এইচএসসি (বিএমটি) শিক্ষাক্রম অনুমোদন ও এমপিওভূক্ত হয়। ২০১২ সালে বিদ্যালয়টি মডেল প্রকল্পভূক্ত হলে তিনতলা ভবন নির্মিত হয়।
শিক্ষার মান ও সহশিক্ষা কার্যক্রম :
বিদ্যালয়ের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক। খেলাধূলায় রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে কৃতীত্ব। স্কাউট ও বিএনসিসি দল ছাড়াও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রয়েছে অনন্য ভূমিকা। বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে ‘মুকুলিকা’, ১৯৮৮ সালে ‘মঞ্জুরী’ ও ২০২০ সালে সার্ধশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ‘প্রস্ফুটন’ নামে স্মরণিকা প্রকাশিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা :
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিদ্যালয়ের ৬৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন।
কৃতীদের আঁতুড়ঘর :
ভারত বিখ্যাত সমাজহিতৈষী ও রাজনৈতিক অশ্বিনী কুমার দত্ত ১৮৬৭ সালে স্কুলের প্রথম ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাবা ব্রজমোহন দত্ত সে সময় লালপুর মুনসেফ চৌকির সাব-জজ ছিলেন।
যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সংগঠক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরহুম হুজ্জোত আলী প্রামানিক ১৯৬০ সালের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী বহু কৃতী বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রেখে চলেছেন।
অতৃপ্তির গ্লানি :
জ্ঞানান্ধকার যুগে ১৮৬৭ সালে অংকুরিত সুপ্ত ভ্রƒণ আর ১৯৪১ সালে যৌবন সুষমায় বিকশিত বিদ্যালয়টি আজ ১৬৯ বছরের জ্ঞানবৃদ্ধ পৌঢ়ত্বেরকাল অতিক্রম করছে।
বিগত সরকারের আমলে নীতিমালার সকল মানদণ্ডে শ্রেষ্ঠ উপজেলা সদরে অবস্থিত লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে (স্মারক নং- ০৩.০০১.০০০.০০.০০.০১.২০১৭.৩৫, তারিখ: ১৩/১১/২০১৭ ইং) জাতীয়করণের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নীতিমালা বহির্ভূতভাবে (স্মারক নং- ০৩.০০১.০০০.০০.০১.২০১৭.৩৭, তারিখ: ২১/১১/২০১৭ ইং) এই বিদ্যালয়ের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত সকল মানদণ্ডে অযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে জাতীয়করণ করে।
জাতীয়করণ প্রাণের দাবি :
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল বারী বলেন, বিগত বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের সময় মূলত লালপুর-বাগাতিপাড়ায় দৃশ্যমান ও ফলপ্রসু উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তাঁর সময়ে এই বিদ্যালয় সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছে। বর্তমান ৫৮ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করবেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাজা শামীম মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ২৯৩ জন। প্রতিষ্ঠানটিতে ৪৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারী ঐতিহ্যগত সুনাম অক্ষুন্ন ও মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে নিরলস কাজ করে চলেছেন। ইতিমধ্যে জাতীয়করনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বরাবর পূণরায় আবেদন করা হয়েছে। আশাকরি জাতীয় করণের সব শর্ত পূরণে সক্ষম প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সুদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে না।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য-সচিব হারুনার রশিদ পাপ্পু বলেন, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির হাজারও গুনী শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সমস্ত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জাতীয়করনের তালিকায় নাম আসার পরেও সে সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিসত্ত্বর প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি।
বিদ্যালয়ের সভাপতি ও লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যমন্ডিত ও সকল মানদন্ডে শর্ত পূরনে সক্ষম প্রতিষ্ঠানটি অবশ্যই জাতীয়করণের জন্য বিবেচিত হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে সব ধরনের সহযোগিতা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রতিশ্রুত সম্ভাবনাময় আশার আলো :
৫৮ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল এ বিষয়ে বলেন, লালপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ১৬৯ বছর ধরে সুনামের সাথে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ নিয়ে বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ইতিমধ্যে বিষয়টা নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জাতীয়করণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাবা মরহুম ফজলুর রহমান পটলের অসমাপ্ত কাজের একটি সফলতার মুখ দেখবে ইনশাআল্লাহ। পর্যায়ক্রমে বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো একে একে বাস্তবায়নের জন্য আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় লালপুর-বাগাতিপাড়ার মানুষের কল্যাণে চমকপ্রদ প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করতে সব সময় সচেষ্ট আছি।