দ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসল ফলান। কিন্তু ফসল ফলানোর আগে থেকেই শুরু হয় তাঁর দুশ্চিন্তা। ভালো বীজ পাবেন তো? সার পাবেন তো? কীটনাশক কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে না তো? আর সবকিছু পেরিয়ে ফসল ঘরে তুললেও মিলবে তো ন্যায্য দাম? একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—কৃষকের জন্য আসলে কোন পথটি খোলা আছে? ধানের বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ, পাটের বীজ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ, আবার চড়া দামে পেঁয়াজের বীজ কিনে অনেক কৃষককে পথে বসার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়—কৃষকের জীবনে প্রতারণা ও লোকসানের যেন এক দীর্ঘ বৃত্ত তৈরি হয়েছে। কৃষকের স্বপ্ন থাকে—ভালো ফলন হবে, ঋণ পরিশোধ করবেন, সংসারে স্বস্তি ফিরবে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে একের পর এক বাধা।

বীজে ঠকেন, সারে ঠকেন, কীটনাশকে ঠকেন; আর ফসল বিক্রি করতে গিয়েও ন্যায্য দাম না পেয়ে ঠকেন। এখানেই কি শেষ?শেষ হওয়াও হলো না শেষে আরও দেওয়ার রয়ে গেছে! ফসল ফলাতে প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশকের বাজারেও কৃষকের জন্য অপেক্ষা করে থাকে আরেক বাস্তবতা—সিন্ডিকেটের দাপট। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত মূল্য কিংবা স্বাভাবিক বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে অনেক সময় কৃষকদের সার ও কীটনাশক কিনতে বাধ্য হতে হয়।প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের চোখের সামনে যদি কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কোথায়? কৃষক যখন সার-কীটনাশকের বাড়তি দামের বোঝা টানছেন, তখন তাঁর উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় সেই বাড়তি উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম বাড়ছে না। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফসলের ন্যায্য মূল্য মিলছে না।

অর্থাৎ কৃষকের জন্য সমীকরণটা এমন খরচ বেশি, ঝুঁকি বেশি, পরিশ্রম বেশি; কিন্তু আয় অনিশ্চিত। আর এই অনিশ্চয়তার সুযোগেই কি এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকের ঘামে ভেজা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে না? মাঝেমধ্যে প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান হয়। অনিয়ম ধরা পড়লে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা বা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে হাজার কিংবা লাখ টাকা জরিমানা কি যথেষ্ট শাস্তি? যদি একজন অসাধু ব্যবসায়ী জানেন—অনিয়ম করে কোটি টাকা আয় করা যাবে, আর ধরা পড়লে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে পার পাওয়া যাবে, তাহলে সেই জরিমানা কি অপরাধ দমন করবে, নাকি অপরাধের ঝুঁকিকে ব্যবসায়িক খরচে পরিণত করবে? এখানেই প্রয়োজন কঠোর, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। শুধু জরিমানা দিয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা সম্ভব নয়। যে ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষককে ঠকাবেন, সরকারি মূল্য অমান্য করবেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবেন কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করবেন তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি লাইসেন্স বাতিল, পুনরায় ব্যবসার সুযোগ বন্ধ এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এখন সময়ের দাবি।কারণ সার-কীটনাশক শুধু কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এগুলো কৃষকের উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ।

এই উপকরণের বাজারে কারসাজি মানে শুধু একজন কৃষককে ঠকানো নয়—এর প্রভাব পড়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন, কৃষি অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। কৃষক যদি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে একদিন কৃষিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। আর খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে এর দায় শুধু কৃষকের নয়—রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেকের ওপর বর্তাবে।

তাই এখন সময় এসেছে কৃষককে শুধু প্রণোদনা দেওয়ার কথা না বলে তাঁর উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সুরক্ষা নিশ্চিত করার। বীজের মান নিশ্চিত করতে হবে। সারের মূল্য ও সরবরাহে কঠোর নজরদারি করতে হবে। কীটনাশকের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে আর সবচেয়ে বড় কথা কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষক কোনো করুণার পাত্র নন। তিনি দেশের খাদ্য উৎপাদনের সৈনিক। তাঁর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা। কৃষক আর কত ঠকবেন? আর কত লোকসান দেবে? আর কতবার তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে রাষ্ট্র যদি কৃষকের পাশে দাঁড়াতে না পারে, তবে কৃষকের ভবিষ্যৎ কোথায়? সময় এসেছে কৃষকের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিটি অনিয়ম, প্রতারণা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার। শাস্তি এমন হতে হবে, যাতে অপরাধী অপরাধ করার আগে একবার নয়—বারবার ভাবেন। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। কৃষি বাঁচলে খাদ্য নিরাপত্তা বাঁচবে। খাদ্য নিরাপত্তা বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। সবার আগে বাংলাদেশ এই স্লোগান তখনই সার্থক হবে, যখন সবার আগে থাকবে বাংলাদেশের কৃষক।