সিলেটে জুড়ে ২৭ দিনে ৫ খুন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি

সিলেট প্রতিনিধি : বিগত কয়েক দিন ধরে সিলেটে বেড়েছে খুন খরাপি। বিগত কয়েক দিনের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদে দেখা গেছে সিলেটে গত ২৭ দিনে পাঁচজন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে একই ঘটনায় খুন হয়েছেন তিন জন। সর্বশেষ গত  রোববার (২৩ আগষ্ট ২০২৬ইং) রাতে নগরের ইসলামাবাদে নিজ বাড়ির কাছে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিনকে।
গত ২৭ জুলাই থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যে পাঁচটি খুনের ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে মতবিনিময় করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি সিলেট মহানগরেরও সংসদ সদস্য।
পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের ওই সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সিলেটের আইনশৃঙ্খলা  কেমন আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমরা কেমন দেখতে চাই। প্রথম হলো, সিলেটে আমরা কোনো মাদকের আনাগোনা দেখতে চাই না। দ্বিতীয়ত, এখানে আমরা কোনো অনলাইন জুয়া দেখতে চাই না।  কোনো কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখতে চাই না।
গত ২৭ জুলাই রাতে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে নগরের কাজিরবাজার সেতুর ওপর ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কিশোর রিফাত আহমদ। এরপর ১২ আগস্ট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা খুন হন। আবদুস সাত্তার সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক ছিলেন।
সর্বশেষ গত রোববার (২৩ আগষ্ট ২০২৬ইং) রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে নগরের ইসলামাবাদ এলাকায় শাহাবুদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। শাহাবুদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বিজয় বাড়ির বাসিন্দা। ২০২০ সালের দিকে তিনি পরিবার নিয়ে শাহপরান ইসলামাবাদ এলাকায় বসবাস শুরু করেন। শাহপরানের (রহ.) মাজারের প্রধান ফটকের পাশে তাঁর একটি দোকান রয়েছে।
নিহতের স্বজনেরা জানান, রোববার (২৩ আগষ্ট ২০২৬ইং) রাতে দোকান থেকে হেঁটে বাড়ির দিকে ফির ছিলেন শাহাবুদ্দিন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে যায়। তাঁর ঘাড় ও গলায় একাধিক  কোপের চিহ্ন ছিল।
নিহতের ছোট ছেলে রেদওয়ান আহমদ বলেন, রাতে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে জানান, তাঁর বাবাকে কেউ আটকে রেখেছে। পরে ঘটনাস্থলের দিকে গিয়ে তিনি বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না বলে জানান তাঁর ভাতিজা আলামিন জুয়েল। তিনি বলেন, তিনি বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের দোকানে হেঁটে যাতায়াত করতেন। ঘটনাটি ছিনতাইয়ের জন্য ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি। কারণ, শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে থাকা আইফোন ও প্রায় ১০ হাজার টাকা অক্ষত ছিল।
নগরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল, মোবাইল টিম পরিচালনা, অপরাধীদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে জানান, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম। তিনি বলেন, ‘কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যবসায়িক বা জমিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকলে নিজেরা ঝামেলায় না জড়িয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
আলোচিত তিন খুন : রায়নগরে তিন খুনের ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের একজনকে  গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে,চুরির উদ্দেশ্যে ওই বাসায় ঢুকে প্রথমে গৃহপরিচারিকাকে দেখে ফেলায় তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে দম্পতিকেও হত্যা করা হয় বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
কাজীরবাজার সেতুতে ছুরিকাঘাতে রিফাত আহমদ খুনের ঘটনার ২৫ দিন পর ২১ আগস্ট মামলার অভিযুক্ত জুয়েল আহমদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরীন আক্তার বলেন, সিলেটে অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঁচটি হত্যাকান্ডের ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় খুনের ঘটনা বাড়ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।