এনজিওতে ফাঁকা চেক-স্ট্যাম্প দিয়ে বিপাকে চাপাই এর রুমা
রাজশাহী ব্যুরো: রুমা খাতুনের স্বামী কাতার প্রবাসী, এবার যাবেন ইউরোপের কোন এক দেশে। প্রয়োজন ৫ লক্ষ টাকা। তাই ঋণের জন্য চেষ্টা করেন বেসরকারি আশা এনজিওতে। তবে ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে রুমা খাতুনের থেকে স্বাক্ষর করা দুটি ফাঁকা চেক ও একটি ননজুডিসিয়াল স্ট্যাম্প নেওয়া হয়েছে। পরে ঋণ না দিয়ে ওই চেক-স্ট্যাম্প অন্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এনজিও কর্মীর বিরুদ্ধে। এতে চরম আইনি হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগী রুমা খাতুন। ঘটনাটি চাপাই নবাবগঞ্জ সদরের এসএমই শাখার (ব্রাঞ্চ কোড-৩৫৩৯)।
ভুক্তভোগী রুমা খাতুন জানান, গত ২৪ মে আশা এনজিও চাপাই নবাবগঞ্জ সদরের এসএমই শাখায় ঋনের জন্য চেষ্টা করলে ফিল্ড অফিসার মো. সুজন আলী তাঁর বাড়িতে যান। যার এনজিও পরিচিতি নাম্বার ৫৩১২১। সদস্য করার কথা বলে প্রথমে ৫০০ টাকা ভর্তি ফি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেন সুজন আলী। ঈদের ছুটি শেষে ঋণ দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
এরপর ৪ জুন এনজিও অফিসার সুজন জানান, ঋণ নিতে হলে ৩০ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা দিতে হবে। তিনি নিজে যেতে না পারায় আশা এনজিওর সদস্য (ঋণ গ্রহীতা) আলামিনের হাতে টাকা দিতে বলেন। সুজনের কথায় বিশ্বাস করে রুমা আলামিনকে ৩০ হাজার টাকা দেন।
কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, ঋণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই এনজিও অফিসার রুমা খাতুনের থেকে স্বাক্ষর করা দুটি ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নিয়ে নেন। পরে ঋণ দেওয়া হবে না বলে তাকে (রুমা) জানানো হয়। তখন রুমা তার দেওয়া চেক ও স্ট্যাম্প ফেরত চান। সুজন জবাবে জানান, আপনি অফিসে এসে নিয়ে যান। প্রতিউত্তরে রুমা জানান, আপনি আমার বাড়ি থেকে চেক ও স্ট্যাম্প নিয়ে গেছেন, আপনি বাড়িতে পৌছে দিবেন। সুজন তার কথা মেনে নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কয়েকদিন পর চেকের জন্য আবারও যোগাযোগ করলে সুজন তাকে জানান, চেক ও স্ট্যাম্প আলামিনের কাছে দেওয়া হয়েছে। যা ওই চেক ও স্ট্যাম্প এখনো তিনি ফেরত পাননি রুমা।
রুমা খাতুনের প্রশ্ন, ঋণই যখন দেওয়া হয়নি, তখন তার স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প কেন নেওয়া হলো এবং কেনই বা তা অন্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হলো? তার ধারনা, ঋণের কথা বলে নেওয়া সেই স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প ব্যবহার করেই তাকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে এনজিওর অফিসার সুজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, রুমা খাতুনের নির্দেশেই চেক ও স্ট্যাম্প পূর্বের সদস্য আলামিনের কাছে দেওয়া হয়েছে। তবে রুমা খাতুনের উপস্থিতিতেই সুজনের এ দাবি তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন। রুমার দাবি, তিনি কাউকে তার স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক বা স্ট্যাম্প অন্যের কাছে দেওয়ার অনুমতি দেননি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ঋণ অনুমোদনের আগেই কেন একজন ঋণপ্রত্যাশীর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দলিল নেওয়া হলো এবং পরে কেন তৃতীয় ব্যক্তির হাতে গেল?
ঘটনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এনজিও শাখার ম্যানেজার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিকরা। তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। তবে ঋণ প্রক্রিয়া সম্পুর্ন না হওয়া পর্যন্ত কোন সদস্যের থেকে কোন ডকুমেন্টস গ্রহন করা হয়না। তারপরও যেহেতু আমার অফিসার ভুল করেছে, তাই আগামীতে ঐ চেক ও স্ট্যাম্প নিয়ে কোন সমস্যা হলে আমরা সহযোগিতা করবো ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে, সুজনের বক্তব্যের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বক্তব্যের সরাসরি বিরোধ রয়েছে। ফলে চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং অন্যের হাতে হস্তান্তরের বিষয়টি এখন তদন্তের দাবি রাখে।
পেছনে আরও বড় যোগসূত্র রয়েছে বলে
রুমা খাতুনের অভিযোগ। কারন, তার মেয়ে তারিন আক্তার জুইয়ের সঙ্গে ইতালিপ্রবাসী জাফর ইকবালের বিয়ে হয়েছিল। পরবর্তীতে দাম্পত্য বিরোধের জেরে তাদের বিচ্ছেদ হয়েছে। এরপর থেকেই তাকে ও তার মেয়েকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে রুমা খাতুন দাবি করেছেন।
রুমার দাবি, তার ব্যাংক হিসাবও বিভিন্ন সময় ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন করা হয়েছে। তবে এসব লেনদেনের প্রকৃতি ও অর্থের উৎস সম্পর্কে ব্যাংক নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় নিজের স্বাক্ষর করা চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারের পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের আগেই স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া, সেগুলো অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরসহ সকল ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রুমা খাতুন।
এবিষয়ে আশা এনজিও’র বিভাগীয় ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নিয়মের বাইরে কাজ করলে ওই কর্মীর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।