যশোর প্রতিনিধি: যশোরের মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামের অসুস্থ্য বৃদ্ধা নবীরুন্নেসা বয়স নব্বই বছর (৯০) বা তার একটু বেশিই হবে। দিনের আলোতে আপসা দেখতে পাই, সন্ধা নামলেই দু’চোখে কিছুই দেখতে পায়না। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কোথায় কিভাবে মারা গেছেন নবীরুন্নেসার স্বামী হবিবুর রহমান তা কেউই বলতে পারেন না।
মুক্তিযুদ্ধের পর ১টি বছর খুঁজে না পেয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বেনাপোলের বারোপোঁতা হতে চলে আাসেন বাবার বাড়ি শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে। বাবার বাড়িতে যে টুকু সম্পদ তার ভাগে ছিলো সেটুকু দিয়ে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সহায় সম্বল সব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে নবীরুন্নেসা।
স্থানীয় এক ব্যাক্তির দেওয়া তথ্য মোতাবেক যশোরের মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে সরেজমিনে গেলে বাস্তবিক এক করুন চিত্র ভেসে ওঠে। অন্যের দেওয়া পরিত্যাক্ত কাঠের নড়বড়ে একটি দোকান পুকুরের উপর ভাসমান অবস্থায় হেলে পড়েছে সামনের দিকে। খুটি নড়বড়ে কাঠের দোকানে বৃদ্ধা ঐ নারী একাকিত্ব জীবন পার করে আসছে বছরের পর বছর,যুগের পর যুগ! যে কোন সময় পানিতেই ধ্বংসে পড়তে পারে নবীরুন্নেসার একমাত্র থাকার ঘরটি।
কাঠের ঐ দোকানের মধ্য নেই কোন বিছানা, না আছে বালিশ-কাথা, না আছে কোন নিরাপত্তা। ভেতরে আছে তার স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি প্যাকেট যা তিনি ঘুমানোর সময়ে বালিশ হিসাবে ব্যবহার করেন। কাঠের ঐ নড়বড়ে ঘরের ভেতর কয়েকটি প্লাস্টিকের জারে শুধুই মুড়ি ভর্তি।
জানতে চাইলে বৃদ্ধার অশ্রুশিক্ত গুমোট আর্তনাদ- আমি খাবো কি,থাকবো কোথায়, দোকানটা ওরা দিছিলো বলে বাঁচা, যাবে তাও এহন দেখতিস ভাংগে পড়েছে! এহন আমি থাকপানে কনে। স্থানীয় ভাবে তার আশপাশের কয়েকটি পরিবার বয়সের ভারে কোথাও যেতে না পারা নবীরুন্নেসাকে খেতে দেই। যে যা দিয়ে যায় তাতেই খেয়ে না খেয়ে চলছে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বেনাপোল বারোপোঁতা হতে স্বামী মৃতঃ হবিবুর রহমানকে হারানো বৃদ্ধা নবীরুন্নেসা।
নবীরুন্নেসার ভাইদের অবস্থা আন-টান, তাদেরই পরিবারের সদস্যরাও দারিদ্র্যের মানবেতর জীবনযাপন করে। প্রতিবেশী কয়েকজনের কথা মোতাবেক, ঐ দোকানটি তার এক ভাইপো এনে দিয়েছিলো, তবে বসতভিটার জমি না থাকায় নবীরুন্নেসাকে আগরহাটি গ্রামের একাধিক মালিকানার একটি বৃহৎ পুকুরের এক কোনে জায়গা করে দেওয়া হয় ২০/২২ বছর আগে। এর আগে নবীরুন্নেসা তার ভাইপোদের বাড়িতেই ঘুমাতো। বৃদ্ধার ২টি মেয়েকে নিয়ে ‘৭১ এর যুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে বহুত খোজাখুজি করেও না পেয়ে ১৯৭৩ সালে বাবর বাড়ি মণিরামপুর শ্যামকুড়ের আগরহাটি গ্রামে এসে ভাই-ভাইপোদের সহায়তায় মেয়ে দুটি বিয়ে দেন বৃদ্ধা নবীরুন্নেসা।
তবে নবীরুন্নেসার ১টি মেয়ে শ্বশুর বাড়ির যৌতুক না দিতে পারায় অত্যাচার-দারিদ্রতায় মনের কষ্টে ২০ বছর আগে আগে আত্মহত্যা করে বলে আক্ষেপ করেন ঐ বৃদ্ধা। অন্য মেয়ে জামায়ের অবস্থা নাজুক। নবীরুন্নেসার দাবী, চোখের দৃষ্টি না থাকায় মানবেতর জবীন যাপনে তার কষ্টের পরিমানটা আরো বৃদ্ধি করেছে। চোখে না দেখায় কোথায়ও যেতে না পারায় কেউ দিলে খায়,না দিলে খালি পেট নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটে নবীরুন্নেসার। স্থানীয় কয়েক জনের নাম উল্লেখ করেও নিয়মিত ভাত/খাবার দেই বলে স্বীকার করে আবার পুনরায় তিনি বলেন, যে দিন কেউ ভুলে যায় সে দিন না খেয়ে থাকি। নবীরুন্নেসা সাহায্যের দাবী রেখেছেন যে, তার চোখের দৃষ্টি ফেরানো! চোখে দেখতে পেলে কারো না জ্বালায়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও খায়ে পরে বাঁচে থাকতে পারতাম! এমনটাই দাবী নবীরুন্নেসার।
স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির নেতা সম্ভাব্য মেম্বার পদপ্রার্থী মামুনুর রশীদ মিন্টু জানান, সম্পর্কে নবীরুন্নেসা আমার ফুফু। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করি সমার্থ্য মতো, যদি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানবিক দৃষ্টি দেন তাহলে হয়তো বৃদ্ধা বয়সে নবীরুন্নেসা নিতান্ত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে।
স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গের সহযোগিতায় শেষ বয়সে নবীরুন্নেসার মানবেতর এ জীবন-যাপনে হাঁপিয়ে উঠেছে গৃহহীন এ বৃদ্ধা। হয়তো দারিদ্র্যতা তাকে নিয়ে এসেছে জীবনের অন্তিমদশার এ বেহাল অবস্থায়। যে বয়সে একজন মানুষ তার অতীত জীবনের ব্যাস্ততার সময় পার করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবেন, বয়সের ভারে শরীরে হাওয়া লাগিয়ে নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্খা পূরনের বায়না করবে! ছেলে-মেয়ে পরিবার পরিজনের সেবায় না হোক কিছুটা আরামে থেকে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করবে। সেখানে নবীরুন্নেসার এ বিভীষিকাময় মানবেতর জীবনযাপন মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে আঘাত করার মতো।
বৃদ্ধার নড়বড়ে কাঠের দোকানের মানবেতর জীবনযাপন এতটায় হৃদয়বিদারক বাস্তবিক যে আপনারাও দেখলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। মানবিক দৃষ্টিতে এ দুর্বিষহ জীবন অবসানের জন্য হলেও সমাজের বিত্তবান শ্রেনীর সুদৃষ্টি কামনা করেছে ভুক্তভোগী নবীরুন্নেসা।