মডেল গ্রাম গঠনে তরুণদের উদ্যোগ ‘টিএফসি-ধর্মদহ’

শিক্ষা, সবুজায়ন ও ক্ষুধামুক্তির লক্ষ্যে অনন্য দৃষ্টান্ত

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ধর্মদহ গ্রামকে একটি “আদর্শ ও মডেল গ্রাম” হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে শিক্ষিত তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম ‘টিএফসি-ধর্মদহ’ (টুগেদার ফর চেঞ্জ)। শিক্ষা, বনায়ন ও ক্ষুধামুক্তি-এই তিন খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংগঠনটি সম্পূর্ণ নিজেদের সদস্যদের আর্থিক অনুদানে ধারাবাহিক সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালের ১০ জুন ধর্মদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সূচনা করে। এ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের ১৫ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সম্মাননা ও উপহার দেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় ৪০,৬৫০ টাকা। এছাড়া ২০ জন গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক উপবৃত্তি এবং গণিত ও ইংরেজিতে বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে আগস্ট থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৫শ টাকা।
শিক্ষার মানোন্নয়নে মে ২০২৬ থেকে বিদ্যালয়ে ২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে এ পর্যন্ত মোট ৬২হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ফ্যান, সুপেয় পানির জন্য টিউবওয়েল এবং স্কুলের সাইনবোর্ড স্থাপনে ব্যয় করা হয়েছে ২৯হাজার টাকা।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টিতে আজ পর্যন্ত কোনো পাকা একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়নি। এই বাস্তবতায় ১৬ জুলাই ২০২৫ কুষ্টিয়ার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নতুন ভবনের অনুমোদনের সুপারিশ চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং গ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সংগঠনটি এ পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৬৭টি গাছ রোপণ করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৬০টি তাল এবং ২ শত ৭ টি গামারি গাছ রয়েছে। এই সবুজায়ন কর্মসূচিতে ৪৫ হাজার ৩০৫ টাকা ব্যয় হয়েছে।
‘ক্ষুধামুক্ত ধর্মদহ’ কর্মসূচির আওতায় মে ২০২৬ থেকে বর্তমানে ১৩টি অতি দরিদ্র পরিবারকে নিয়মিত খাদ্যসহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যার মাসিক বাজেট ২৪ হাজার ৮শ টাকা। প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করতে সংগঠনটি আয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ও সরকারি ভাতার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি বিজ্ঞানসম্মত জরিপ ফরম তৈরি করে। এই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই পদ্ধতি এলাকায় প্রশংসিত ও দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনটির তহবিলে মোট ৩ লক্ষ ২৪ হাজার ২৯০ টাকা অনুদান সংগৃহীত হয়েছে। যার বিপরীতে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে মোট খরচ হয়েছে ২ লক্ষ ৭২ হাজার ২৯০ টাকা। আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অর্থ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন ১জন ক্যাশিয়ার ও একজন রিমোট প্রতিনিধি।
এই কর্মসূচীর আওতায় চাল ডাল থেকে শুরু করে একটি সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসহায়তা পেয়ে সবাই খুশি। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজট হামজুর রহমান বলেন, সংসারে আয় করার লোক নাই আমার, কোন রকম খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা ফেরা করি, নিজের চিকিৎসা খরচ চালাতে পারি না, খাবো কি দিয়ে? গত ৬ মাস এই সংগঠন থেকে খাদ্য সহায়তা পাই তা দিয়ে আমাদের দ’জনের সংসার ভালোভাবে চলে যাচ্ছে। ব্রেইন স্ট্রোকের সাথে লড়াই করে বেচে থাকা রোকেয়া খাতুন জানায়, সংসারে আয় করার লোক নেই। এখান থেকে চাল, ডাল, তেল সহ নানা খাদ্যসহায়তা পাই প্রতি মাসের ২ তারিখে তাই দিয়ে কোন রকম সংসার চলে।
ধর্মদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো: আবু তালেব বলেন, বিদ্যালয়ের ১৫ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সম্মাননা ও উপহার দেয়া, ২০ জন গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক উপবৃত্তি এবং গণিত ও ইংরেজিতে বিনামূল্যে প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা করা। বিদ্যালয়ে ২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় প্রদান, এ ছাড়া প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ফ্যান স্থাপন, সুপেয় পানির জন্য টিউবওয়েলের ব্যাবস্থা সহ স্কুলের সাইনবোর্ড স্থাপন করে দেয় “টিএফসি ধর্মদহ”।
সংগঠনের প্রথম উদ্যোক্তা এম. জি. আযম (জুলিয়ান) বলেন, “আমরা কেবল সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত তরুণ হতে চাইনি, বরং শিক্ষার আলো দিয়ে আমাদের মাতৃভূমি ধর্মদহকে একটি আদর্শ ও মডেল গ্রামে রূপান্তর করতে চেয়েছি। তরুণদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ধরে রাখতে পারলে গ্রামীণ উন্নয়নে এটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।”
সংগঠনের অন্যতম উদ্দ্যোক্তা অধ্যাপক ড. সাজেদুল ইসলাম বলেন, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দল-মত নির্বিশেষে পুরো গ্রামের মানুষকে যুক্ত করে এই প্ল্যাটফর্মটির পরিসর বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে ২ মে ২০২৫ এক অনলাইন সভায় সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সাত দফা মূলনীতি অনুমোদন করা হয়, যেখানে অরাজনৈতিক অবস্থান, শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের অন্যতম শিল্পগ্রুপ পিএইচপি গ্রুপের অর্থায়নে আগামী নভেম্বর ২০২৬ থেকে ‘ক্ষুধামুক্ত ধর্মদহ’ কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৭টি করা হচ্ছে। এছাড়া একই গ্রুপের অর্থায়নে ১৬টি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মধ্যে ‘স্বাস্থ্যকার্ড’ বিতরণ করা হবে, যার মাধ্যমে তারা নিয়মিত বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবে। পরবর্তীতে গ্রামের পিছিয়ে পড়া পরিবার গুলোকে স্বনির্ভর করার লক্ষে আত্ম কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করার পরিকল্পনা আছে বলেও জানান তিনি।