রাজশাহী ব্যুরো: যে বাহিনীকে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বলা হয়ে থাকে, আজ তাদের বিরুদ্ধেই সীমান্ত রক্ষার নজরদারি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্তে নজরদারিতে অবহেলা, গরু খোয়াড়ে রেখে জরিমানা আদায় করাসহ, বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চর খানপুর সীমান্ত ক্যাম্পের বিরুদ্ধে।
গত ১৫ এপ্রিল দুপুরে চরখানপুর (চর খিদিরপুর) এলাকার ষাটবিঘার চরে গরু চরাতে গিয়ে প্রায় ২০০টি গরু ভারতের অংশে ঢুকে পড়ে। এরপর ভারতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গরুগুলোর ছবি তুলে বিজিবিকে পাঠিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গরুগুলো সরিয়ে নিতে বলেন। বিএসএফ এর এমন অভিযোগের পর খানপুর ক্যাম্পের ইনচার্জ (সুবেদার) সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে গরুগুলো আটক করে খোয়াড়ে নেয়। এমন ঘটনায় বিজিবির ভূমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, গরুগুলো সীমান্ত সংলগ্ন চরে চরানোর সময় ভুলবশত ভারতের অংশে ঢুকে পড়ে। তবে প্রশ্ন উঠেছে সীমান্তে নিয়মিত টহল ও নজরদারির দায়িত্বে থাকা বিজিবি নিয়ে। তারা কেন আগে থেকে বিষয়টি জানতে পারেনি? কেন বিএসএফ জানানোর পর তাদের তৎপরতা দেখা গেল? যদি গরুর জায়গায় পাচারকারিরা মাদক ও অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাহলে তাদের ভূমিকা কি? আবার মজার বিষয় হলো, ঘটনা ঘটছে ১৫ তারিখ দুপুরে, জরিমানা নিলেন ১৬ তারিখে। ঘটনাটি মিডিয়ার নজরে আসলে ১৭ তারিখ বিকালে। বিষয়টি গণমাধ্যমের নজরে আসলে ঘটনা ১৭ তারিখের ঘটনা বলে জানানো হয়েছে। ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে চর খানপুর উপস্থিত হয় সাংবাদিক একটি টিম। ব্যাপারটি বিজিবি সদস্যরা বুঝতে পেরে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারিভাবে ১৭ তারিখের ঘটনা বলে রেকর্ডভুক্ত করেন।
এঘটনায় ভুক্তভোগী গরুর মালিক মেরাজুল, সিজান, চনা, হুমা, আনারুল ও আজিমসহ কয়েকজন জানান, তারা সাধারণ কৃষক, সীমান্তের নিয়ম-কানুন তেমন বুঝেন না। কিন্তু বিজিবির উচিত ছিল আগে থেকে আমাদের সতর্ক করা। অথচ তারা তা করেননি, বরং পরে গরু ধরে জরিমানা করেছে। শুধু গরু ধরেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের (গরু মালিক) থেকে মোটা অংকের টাকাও নিয়েছে বিজিবি। তবে এই টাকা লেনদেনের ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
সূত্র বলছে, ১৫ তারিখের ঘটনা হলেও সেটি গড়িয়ে পরদিন ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে গরুগুলোর মধ্যে অন্তত ১৮০টির বিপরীতে মোট প্রায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন গরুর মালিকরা। বিজিবি বলছে ১২০ টি গরুর জরিমানা ১২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। যা ৮ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে।
এদিকে খোয়াড় ইজারাদার সাজ্জাদ হোসেন দাবি করেন, তিনি ঘটনাস্থলে যাইনি। গ্রামের লোকজন হিসাব করে তাকে ১২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়েছে। খোয়াড়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ইজারার কাগজপত্র স্থানীয় মেম্বারের কাছে রয়েছে এবং খোয়াড়ের বর্তমান মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিজিবি ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবেদার সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, প্রায় ২০০টির মতো গরু ছিল, তবে ১২০টির জরিমানা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জরিমানার টাকা কার কাছে গেছে, এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি এবং পরে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। কারন সামাজিকভাবে মান ক্ষুন্ন হবে এবং অফিসিয়ালি ঝামেলায় পড়তে হবে।
এদিকে গরুর মালিকদের দাবি, তারা সরাসরি বিজিবির সদস্যদের হাতেই টাকা দিয়েছেন। কিন্তু বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টাকা খোয়াড়ের ইজারাদারের কাছে গেছে যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (৯ নং ইউপি সদস্য) নিজ উদ্যোগে সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। আরও অনেক কিছু আছে যা বলা যাবে না।
সব মিলিয়ে সীমান্তে বিজিবির দায়িত্ব পালনে অবহেলা, খোয়াড়ের বৈধতা, জরিমানার অর্থ লেনদেন এবং তথ্য গোপনের চেষ্টাসহ এমন একাধিক প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এবিষয়ে বর্ডারগার্ড ব্যাটেলিয়ন-১ এর মিডিয়া মুখ্যপাত্রের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
এ বিষয়ে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তবে সংবাদ প্রকাশের ব্যাপারে স্থানীয়রা জানান, সংবাদ প্রকাশ হলে তাদের উপর আইন প্রয়োগের মাত্রাটা বাড়বে। এতে সেখানে তাদের টিকে থাকায় দায় হবে।
ডেইলী নিউজ বাংলা ডেস্ক 




















