তিন জেলার সীমান্ত করতোয়া নদীর চরে জুয়ার আসর -যৌথ অভিযান ছাড়া ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ও নবাবগঞ্জ এবং রংপুরের পীরগঞ্জ থানার সীমান্তঘেঁষা করতোয়া নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর যেন নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের দুর্গম চরাঞ্চলে প্রতিদিন লাখ টাকার জুয়ার আসর বসলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা। প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকার এ জুয়ার আসরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযান পরিচালিত হলেও কিছু সময়ের বিরতির পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে জুয়ার চক্র।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার কুলানন্দপুর গ্রামের নির্জন বালুচরে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে জমে উঠছে জুয়ার আসর। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মাইক্রোবাস, সিএনজি, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও অটোভ্যানে করে মানুষ সেখানে আসছেন। দূর থেকে পুরো এলাকাটি অনেকটা অস্থায়ী হাটবাজারের মতো মনে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত ও প্রভাবশালী চক্র। জুয়ার সঙ্গে জড়িত অনেকেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকেন। নদীপথের মাঝি, চরাঞ্চলে অবস্থান নেওয়া সোর্স এবং বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। ফলে অভিযানের খবর মুহূর্তেই পৌঁছে যায় আয়োজকদের কাছে। এতে তারা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে কিংবা পাশের থানার সীমানায় সরে গিয়ে আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিন থানার সীমান্তবর্তী অবস্থানই জুয়ার কারবারিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা। ঘোড়াঘাট এলাকায় অভিযান শুরু হলে তারা নবাবগঞ্জ কিংবা পীরগঞ্জ অংশে সরে যায়। আবার অন্য থানার অভিযান শুরু হলে মুহূর্তেই অবস্থান বদলে ফেলে। এ কারণে অধিকাংশ সময় মূল হোতা ও বড় জুয়ারুরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান এই চক্রের জন্য বড় কোনো বাধা নয়। বরং তিন থানার সমন্বয়ে পরিকল্পিত ও একযোগে পরিচালিত যৌথ অভিযানই পারে জুয়ার আসরের মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে। তাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর অনেক অভিযুক্ত দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন, যা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু জুয়া নয়, জুয়ার এ আসরকে কেন্দ্র করে এলাকায় মাদকের বিস্তার লাভ করেছে। জুয়া ও মাদকের বিস্তার শুধু অপরাধই বাড়াচ্ছে না, সামাজিক অবক্ষয়ও ত্বরান্বিত করছে। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে অনেক তরুণ এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে পরিবারে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, “করতোয়া নদীর ওপারের তিন থানার সীমান্তবর্তী দুর্গম ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘোড়াঘাট থানা পুলিশের একটি টিম সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এর আগে একাধিক অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে এই জুয়ার আসর বন্ধ করতে তিন থানার সমন্বিত ও নিয়মিত যৌথ অভিযান প্রয়োজন।
Print [1]