ডেইলী নিউজ বাংলা ডেস্ক , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

৬ ছেলের ঘরেও আশ্রয় হলো না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুর

যে সন্তানদের বুকে আগলে রেখে বড় করেছেন, যাদের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের সঞ্চয়, শ্রম আর মমতা উজাড় করে দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই ছয় ছেলের কারও ঘরেই আশ্রয় হলো না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুর। বার্ধক্য আর অসুস্থতায় নুয়ে পড়া এই মায়ের ঠাঁই হয়েছে শেষ পর্যন্ত মেয়ের বাড়িতে।

অথচ তার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়-স্বামীর ভিটায় ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর, যেখানে শেষ জীবনটা অন্তত মাথা গোঁজার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে কাটাতে পারবেন।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের এই বৃদ্ধার জীবনের গল্প এখন স্থানীয় মানুষের আলোচনার বিষয়।

কিন্তু বয়সের ভারে যখন নিজেই অন্যের সহায়তার মুখাপেক্ষী, তখন সেই সন্তানদের ঘরেই যেন জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে তার জন্য।

গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে ছেলেদের কারও ঘরে আশ্রয় না পেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েন জয়নব ভানু। অভিযোগ, এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। দীর্ঘক্ষণ দরজায় টোকা দিয়েছেন, ডাকাডাকি করেছেন। কিন্তু কারও সাড়া পাননি। একসময় বন্ধ দরজার সামনে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বৃদ্ধা।

সন্তানদের কাছে আশ্রয় চেয়ে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত পরিচিত মাটিতে কাটানোর এই আকুতি শুনে এগিয়ে আসেন স্থানীয় কয়েকজন যুবক। তাদের সামনেই নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন জয়নব ভানু।
তার চোখের জল আর আশ্রয়ের আকুতির খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় সৃষ্টি হয় আলোচনা-প্রতিক্রিয়ার। তবে বৃদ্ধার অভিযোগের বিপরীতে পরিবারের সদস্যরা তুলে ধরেছেন ভিন্ন বক্তব্য।

জয়নব ভানুর মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, তার মা দীর্ঘ এক বছর কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি জানেন না। তিনি মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলেও জানান। বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, বৃদ্ধা তাদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।

তবে মায়ের এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন তিনি। ঝর্ণা বেগম বলেন, মায়ের খবর শুনে আমি ছুটে আসি। বিশ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। তারা চায়, আমার মাকে আমার বাড়িতে তুলে দিতে।

ছয় ছেলের কেউ মাকে নিজের ঘরে রাখতে না পারলেও মেয়ের কাছে আশ্রয় পেয়েছেন জয়নব ভানু। বর্তমানে ঝর্ণা বেগমের বাড়িতেই রয়েছেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের বক্তব্যে ভিন্ন দাবি থাকলেও বৃদ্ধার আশ্রয় ও দেখভালের বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি করেছে।

স্থানীয় আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের সঙ্গে এমন ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সামাজিকভাবে ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

এদিকে ঘটনাটি জানার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যদের তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে খোঁজখবর নেন। জানা গেছে, জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম বাড়িতে থাকেন। বাকি চার ছেলে প্রবাসে রয়েছেন।

জীবনের এতগুলো বছর পার করে এসে জয়নব ভানুর চাওয়া এখন খুব সামান্য। তিনি চান, স্বামীর ভিটায় একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে নিজের মতো করে থাকতে পারবেন, মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে হবে না পরবাসীর মতো, অন্যের আশ্রয়ে।

একসময় যে মা সন্তানদের আগলে রেখে বড় করেছেন, সেই মায়েরই আজ আশ্রয়ের জন্য দরজায় দরজায় অপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। তার এই অসহায়ত্বের বিপরীতে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও রয়েছে। তবে সব বক্তব্যের ঊর্ধ্বে থেকে সামনে এসেছে একটি জরুরি প্রশ্ন-বার্ধক্যে মা-বাবার নিরাপদ আশ্রয় ও যত্ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে? জয়নব ভানুর শেষ আশ্রয় এখন মেয়ে ঝর্ণা বেগমের বাড়ি। তার গল্প কেবল একটি পরিবারের টানাপোড়েনের ঘটনা নয়; এটি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের দায়বদ্ধতা এবং সমাজের মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনারও অবকাশ তৈরি করে।