রাজশাহী ব্যুরো: শ্রেণিকক্ষ বলতে ছিল একটি বারান্দা, আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিন জন। ছিল না আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবেশ। তবু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন থেমে থাকেনি গিরিধরের। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট উদ্যোগই হয়ে উঠেছে একটি জনপদের শিক্ষার বাতিঘর। অর্থাৎ মাত্র ৩জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির নাম লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
একসময় যে বিদ্যালয়ে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়তে আসত, আজ সেই প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভীড়। বর্তমানেও এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। শতবর্ষের সেই গৌরবময় পথচলা উদযাপন করেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টায় বের করা হয় বর্ণাঢ্য র্যালি। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় প্রাক্তন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ এবং অতিথিদের বক্তব্যে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠী, প্রিয় শিক্ষক ও পরিচিত মুখগুলোর মিলনমেলায় সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। স্মৃতির পাতায় ফিরে গিয়ে অনেকে তুলে ধরেন শৈশবের দিনগুলো, বিদ্যালয়ের পুরোনো দিনের গল্প আর জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবদানের কথা।
স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের স্মৃতিতে, প্রায় এক শতাব্দী আগে হিন্দু সম্প্রদায়-অধ্যুষিত এই এলাকায় শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। এমন সময়ে এলাকার জ্ঞানী ব্যক্তি গিরিধর সরকার উদ্যোগ নেন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। ১৯২৫ সালে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করেন তিনি। শুরুতে বিদ্যালয়ের পাঠদান চলত একটি বারান্দায়।
সেই সময়ের বাস্তবতায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল শুধু পাঠশালা গড়ে তোলা নয়, বরং শিক্ষার গুরুত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার সংগ্রাম। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, প্রসারিত হয় শিক্ষার পরিধি। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয় পাঠদানের ঘর। গিরিধর সরকারের উদ্যোগ ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে বিদ্যালয়টি।
শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে এসে সেই প্রতিষ্ঠানই বহু মানুষের শিক্ষাজীবনের প্রথম ঠিকানা হয়ে ওঠে।
লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের শৈশব, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্য। এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে অনেকেই দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ কেউ দেশের বাইরেও সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে জীবনের প্রথম পাঠশালার অবদান, শিক্ষকদের স্নেহ ও শাসন, আর শৈশবে দেখা বড় হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নেরই একটি উদাহরণ বিদ্যালয়টির শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি মো. খলিলুর রহমান শেখ। তিনি বর্তমানে দুর্গাপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বিদ্যালয়টির ইতিহাসে রয়েছে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সাফল্যও। এ প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত ৪৪ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিদ্যালয়টির অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শতবর্ষের গৌরবের পাশাপাশি বিদ্যালয়টির সামনে রয়েছে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন সাতজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী। শিক্ষার্থীদের বই পড়ার সুযোগ করে দিতে রয়েছে একটি লাইব্রেরিও। তবে শতবর্ষের ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো গড়ে ওঠেনি যুগোপযোগী অবকাঠামো। ১৯৭২ সালে নির্মিত একটি ভবন বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ।
একটি বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যে বিদ্যালয় একসময় বারান্দায় পাঠদানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, শতবর্ষ পেরিয়ে সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে এ প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
শতবর্ষ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দুর্গাপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি মো. খলিলুর রহমান শেখ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান এবং রায়ঘাটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ইমাম হাসান শামীম, উপজের বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আব্দুস সামাদ, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বাচ্চু রহমান, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজিম উদ্দিন, উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাবলু, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহব্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা যুবদল নেতা মির্জা শওকতসহ প স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মোহনপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আব্দুস সামাদ এবং বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষিকা মাস্তুরা পারভীন।
শতবর্ষের এই আয়োজন ছিল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের অর্জন উদযাপন এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রত্যয়ের এক মিলনমেলা। গিরিধর সরকারের হাতে গড়ে ওঠা সেই ছোট্ট পাঠশালার ইতিহাস আজও মনে করিয়ে দেয়। একজন মানুষের উদ্যোগ বদলে দিতে পারে পুরো জনপদের ভবিষ্যৎ। আর সেই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ।
ডেইলী নিউজ বাংলা ডেস্ক 





















