শতবর্ষের ইসলামপুর ক্লাব: মাঠ থেকে মঞ্চে
এম রহমানঃ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রাম। এই গ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে একটি প্রতিষ্ঠান—ইসলামপুর ক্লাব। শতবর্ষের পথ পেরিয়ে ক্লাবটি আজ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি একটি জনপদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
এই ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন নানা অঙ্গনের বহু গুণী মানুষ। কেউ ফুটবলার, কেউ কবি-সাহিত্যিক, কেউ নাট্যকার, কেউ সংগীতশিল্পী, আবার কেউ যাত্রাপালার শিল্পী। তাঁদের কেউ নামী-দামি ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলেছেন, কেউ বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী হয়েছেন, কেউবা পেশাজীবনে প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকের ঈদ-উৎসবঃ
ইসলামপুর ক্লাবের স্মৃতিতে নব্বইয়ের দশক একটি বিশেষ অধ্যায়। ঈদুল আজহার পরের দিন থেকে টানা তিন দিন বসত জমজমাট ঈদ পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কোরবানির ঈদের আনন্দ যেন তখন আরও কয়েক দিন বাড়িয়ে দিত এই আয়োজন।
তবে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হতো ঈদের অনেক আগেই। প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঁশ ও চৌকি সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে যেত। এখনকার মতো ডেকোরেটর বা তৈরি মঞ্চের ব্যবস্থা ছিল না। তাই আয়োজনের প্রায় প্রতিটি কাজ নিজেদের হাতেই করতে হতো।
মঞ্চ তৈরির সময় হাফিজ সরকার কুষ্টিয়া থেকে ককশিট ও আলপনা করার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসতেন। ঈদের দুদিন আগে বড় টেপ দিয়ে মঞ্চের মাপজোক করে প্রস্তুতি শুরু হতো।
এই কাজে সামনে থাকতেন সালে আহমেদ ভাই, হাফিজ সরকার, ইমারুল ভাই, স্বপন ভাই, শাহীন সরকার ও আসাদুল হক। বাঁশের পাটাতন তৈরি করে তার ওপর চৌকি বসানোর জন্য দু-একজন শ্রমিক নেওয়া হলেও মঞ্চের মূল কাঠামোর কাজটা করতে হতো নিজেদেরই।
মঞ্চের চার খুঁটি দাঁড় করানো, ওপরের চাঁদোয়া লাগানোসহ কঠিন কাজগুলো সামলাতেন সজল সরকার, ফয়সাল,জহুরুল সরকার,মিজানুর রহমান রিপন ও মুক্তার সরকার। কাজটা সহজ ছিল না, কিন্তু আনন্দেরও কমতি ছিল না।
কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ দড়ি বাঁধছেন, কেউ মঞ্চের মাপ নিচ্ছেন, কেউ চৌকি টানছেন—সব মিলিয়ে ঈদের আগেই ক্লাব প্রাঙ্গণে শুরু হয়ে যেত উৎসবের আমেজ।
ডেকোরেটর ছিল না, আধুনিক সরঞ্জামও ছিল না। ছিল নিজেদের শ্রম, আন্তরিকতা আর একসঙ্গে কিছু করার আনন্দ। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও সবাই মজা করে কাজ করতেন। কারণ তাঁরা জানতেন—এই মঞ্চ শুধু একটি অনুষ্ঠানের জন্য নয়; এটি ছিল পুরো এলাকার মানুষের মিলনস্থল।
তারার আলোয় গ্রামের মঞ্চঃ
মঞ্চ তৈরির পর শুরু হতো মূল আয়োজন। নবীন শিল্পীদের অংশগ্রহণ থাকলেও দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল দেশের পরিচিত শিল্পীরা। ইসলামপুর ক্লাবের সেই অনুষ্ঠানে একসময় উপস্থিত হয়েছেন মনির খান, গীতিকার মিল্টন খন্দকার এবং ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ গানের শিল্পী ফকির আলমগীর- শফি মন্ডল, সরকার আমিরুল ইসলাম, মোকলেছুর রহমান মিন্টু, জাহিদুল ইসলাম ঝালু,মামুন সরকার,সুফিয়া কাঙ্গালীনী, চুমকিএর মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা।
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন তাঁদের গান শুনতে। সন্ধ্যা নামতেই মঞ্চের চারপাশে জমে উঠত মানুষের ভিড়। ঈদের আনন্দ, পরিচিত শিল্পীদের গান আর স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা—সব মিলিয়ে ইসলামপুরে তৈরি হতো উৎসবের আবহ।
গানের উত্তরাধিকারঃ
ইসলামপুরের সংগীতচর্চার ইতিহাসও সমৃদ্ধ। গোলাম রহমান আতু ছিলেন এই ধারার অগ্রণী শিল্পীদের একজন; ইসলামপুর থেকে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ বেতারে গান করার কৃতিত্ব তাঁর।
পরবর্তী সময়ে এই সাংস্কৃতিক ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন ওস্তাদ শফি মন্ডল, সরকার আমিরুল ইসলাম, বাবু সরকার । তাঁদের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁদের গুরু মোখলেছুর রহমান মিন্টুর।
একদিকে ফুটবল মাঠে খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সেই একই ক্লাবের ছায়ায় গড়ে উঠেছে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও যাত্রাশিল্পী। এটাই ইসলামপুর ক্লাবের বিশেষত্ব।
এখন যা স্মৃতিঃ
সময় বদলেছে। এসেছে আধুনিক ডেকোরেটর, ডিজিটাল মঞ্চ, সাউন্ড সিস্টেম ও নানা প্রযুক্তি। কিন্তু সেই সময়ের মতো বাঁশ-চৌকি সংগ্রহ করে, নিজের হাতে মঞ্চ বানিয়ে, ঈদের আগের রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করার দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।
তবু যারা সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাছে স্মৃতিগুলো আজও জীবন্ত। তাঁদের কাছে ইসলামপুর ক্লাব মানে শুধু একটি মাঠ বা সংগঠন নয়—এটি বন্ধুত্ব, শ্রম, আনন্দ আর সম্মিলিত সৃষ্টির এক অনন্য অধ্যায়।
বাঁশের পাটাতনের সেই মঞ্চ হয়তো আজ নেই, কিন্তু সেই মঞ্চ তৈরির হাসি-আড্ডা, ঘাম আর আনন্দ এখনো রয়ে গেছে মানুষের স্মৃতিতে।
আর সেই স্মৃতিই প্রমাণ করে—একটি ক্লাব কখনো কখনো শুধু অনুষ্ঠান করে না, একটি প্রজন্মের জীবনকেও গল্পে পরিণত করে।
ডেইলী নিউজ বাংলা ডেস্ক 


















