ঢাকা ০৭:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
বাগমারায় ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা কালীগঞ্জে রূপসা পরিবহনের বাসের ধাক্কায় পৌর কর্মচারী নিহত, আহত ২ নাসিরনগরে ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ এর শুভ উদ্বোধন প্রবাসীর স্ত্রী-সন্তানের গলায় দা ধরে ডাকাতি নাগরপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর পাশে এমপি রবিউল আওয়াল লাভলু-১ লাখ টাকার সহায়তা চেক হস্তান্তর সরকারি দামে সিলিন্ডার মেলা ভার: ভেড়ামারায় এলপিজি নিয়ে নৈরাজ্য, ক্ষুব্ধ ভোক্তা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই শতভাগ যুবকদেরকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়তে চাইঃ-  যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক বদলির আদেশের পরও বহাল তবিয়তে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের ৭ কারারক্ষী।। ভুয়া ফেসবুক আইডি সনাক্ত ও আইনী ব্যবস্থা গ্রহনে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম রাজশাহী প্রেসক্লাবের কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি মাঠ থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ

অদৃষ্টের হাসি

অদৃষ্টের হাসি

তপু রায়হান—নামটা শুনলেই মনে হয় কোনো নায়কের গল্প শুরু হবে। লম্বা-চওড়া, ছিপছিপে গড়ন, পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির দীর্ঘদেহ, চোখ দুটো যেন কালো জলের ফোয়ারা। প্রথম দেখায় যে কোনো নারীর চোখ আটকে যেত তার দিকে। কিন্তু এখন? বয়স পঞ্চাশ, চুলে পাক ধরা, চোখের নিচে কালি, আর জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার।

কৈশোরে নিরবে প্রেম এসেছিল একদিন। মেয়েটা প্রায়ই তাকে দেখে হাসত। তপু লাজুক স্বভাবে জিজ্ঞেস করত, “কেমন আছো তুমি? তোমার হাসিতে মনে হয়, প্রেম না দিলেও চলবে—শুধু হাসিই যথেষ্ট।” মেয়েটি মিষ্টি সুরে বলত, “ঘিন্না লাগে!” তপু হেসে উত্তর দিত, “এতদিন ধরে তোমার হাসি দেখছি, কিন্তু আমার ঘেন্না তো শেষ হয় না। আমি আর কতকাল ঘেন্নার পাত্র হয়ে থাকব?” ওই হাসিই ছিল তার প্রথম অঙ্কুরিত ভালোবাসা—যা কখনো ফুল হয়ে ফুটতে পায়নি।

তপুর জীবনে এসেছে অনেক মেয়ে। সবাই বলেছে, “তুমি খুব ভালো মানুষ!” কিন্তু কেউ বলে নি, “তুমি খুব ভালো প্রেমিক!” প্রথম প্রেমিকা তাকে শুধু বন্ধু ভাবত, প্রেমিক নয়। তবুও তপু প্রথাগত ভালোবাসায় ডুবে ছিল, আর সেই বিরহে বেছে নিয়েছিল নিঃসঙ্গতা। এভাবেই তার সাথে বন্ধুত্বের ছাড়াছাড়ি হয়। এই বিচ্ছেদেই তাকে নেশার জগতে টেনে আনে। এরপরও আরেকজনকে ভালোবাসত, কিন্তু বিয়ে করল অন্যকে। কারণ, হিসাবে মেয়েটি বলল”তুমি খুব ইমোশনাল, সংসারের ভার নিতে পারবে না!” শেষে বিয়ে করেছিলেন সুন্দরী এক মেয়েকে। কিন্তু তিন বছর পরেই সে চলে গেল। বলেছিল, *”তুমি শুধু গান শুনে আর কবিতা লিখে সময় কাটাও। আমাকে দেওয়ার মতো সময় তোমার নেই!” তাইতো তার উপলব্ধি সুন্দর মুখ মানুষকে সর্বদাই বঞ্চিত করে।

একসময় ভালো চাকরি ছিল, মন দিয়ে চাকরি করতে না পারাতে, বস একদিন বললেন, *”তপু, তুমি খুব ক্রিয়েটিভ, কিন্তু অফিসে ঘুমাও বেশি! তোমার মত ক্রিয়েটিভ মানুষ যে আমার চলবে না। আমার দরকার কাজের মানুষ। ভালো চাকরি ছিল, ঘরের সুন্দরী স্ত্রী ছিল, ফুটফুটে চাঁদমুখো কন্যা ছিল। আজ আর কিছু নেই।

চাকরি চলে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে দোকান খুললেন। কিন্তু দোকান ভালো চলল না। অবশেষে নানান চিন্তায় স্ট্রোক করে বসলেন। একেবারে মৃত্যুর দুয়ার তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। জীবন ও মৃত তার কাছে দুটোই সমান। এখন এই গোধূলি লগ্নে এসে শুধুই মনে পড়ে কিশোর বেলার সেই স্মৃতি। তবুও তার কোন আক্ষেপ নেই। সে চলে তার মত করে। নিজের মেয়ের মুখটা ছুয়ে দেখতে পারেনি। এই কষ্ট তাকে আর পীড়া দেয় ভীষণভাবে। একদিন সে জানতে পারে, প্রথম পক্ষের মেয়ে বিয়ে করে চলে গেল। শুধু একবার এসেছে”বাবা, তোমাকে শেষবার দেখতে এসেছি! বাবার কোন স্মৃতি তার তেমন মনে পড়ে না এখন তপুর একমাত্র সঙ্গী—সিগারেট। দিনে প্যাকেট, রাতে আরও প্যাকেট। “এটাই আমার শেষ সান্ত্বনা!”

একদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে, তপু আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। নার্স জিজ্ঞেস করল, “কি হাসছেন?” তপু উত্তর দিলেন— “ভাগ্য আমাকে এত কিছু শিখিয়েছে! চাকরি দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে। প্রেম দিয়েছে, ভাঙিয়েছে। স্ত্রী দিয়েছে, ছেড়ে গেছে। এখন শুধু সিগারেটই আমাকে ছাড়ে নি… হে আল্লাহ, আমাকে তুমি সিগারেটখোর থেকে বিড়িখোর বানিও না!” এটাই আমার শেষ ইচ্ছা ”

হাসপাতালের সাদা চাদরে মোড়া তপু আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল। জানালার গ্রিলে বসা চড়াই পাখিটা হয়তো তার যৌবনের কোনো কবিতার লাইন মনে পড়িয়ে দিল। নার্সের চোখে জল এসে গেল – সে জানত না এই হাসি কি কিশোর তপুর প্রথম প্রেমের স্মৃতি, না মধ্যবয়সের ব্যর্থতার বিদ্রূপ, না মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ উপলব্ধি… শুধু জানত, আজ রাতের ডিউটিতে আবার এই রুমেই হয়তো সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।”

Tag :

বাগমারায় ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

অদৃষ্টের হাসি

আপডেট টাইম : ০৯:০১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫

অদৃষ্টের হাসি

তপু রায়হান—নামটা শুনলেই মনে হয় কোনো নায়কের গল্প শুরু হবে। লম্বা-চওড়া, ছিপছিপে গড়ন, পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির দীর্ঘদেহ, চোখ দুটো যেন কালো জলের ফোয়ারা। প্রথম দেখায় যে কোনো নারীর চোখ আটকে যেত তার দিকে। কিন্তু এখন? বয়স পঞ্চাশ, চুলে পাক ধরা, চোখের নিচে কালি, আর জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার।

কৈশোরে নিরবে প্রেম এসেছিল একদিন। মেয়েটা প্রায়ই তাকে দেখে হাসত। তপু লাজুক স্বভাবে জিজ্ঞেস করত, “কেমন আছো তুমি? তোমার হাসিতে মনে হয়, প্রেম না দিলেও চলবে—শুধু হাসিই যথেষ্ট।” মেয়েটি মিষ্টি সুরে বলত, “ঘিন্না লাগে!” তপু হেসে উত্তর দিত, “এতদিন ধরে তোমার হাসি দেখছি, কিন্তু আমার ঘেন্না তো শেষ হয় না। আমি আর কতকাল ঘেন্নার পাত্র হয়ে থাকব?” ওই হাসিই ছিল তার প্রথম অঙ্কুরিত ভালোবাসা—যা কখনো ফুল হয়ে ফুটতে পায়নি।

তপুর জীবনে এসেছে অনেক মেয়ে। সবাই বলেছে, “তুমি খুব ভালো মানুষ!” কিন্তু কেউ বলে নি, “তুমি খুব ভালো প্রেমিক!” প্রথম প্রেমিকা তাকে শুধু বন্ধু ভাবত, প্রেমিক নয়। তবুও তপু প্রথাগত ভালোবাসায় ডুবে ছিল, আর সেই বিরহে বেছে নিয়েছিল নিঃসঙ্গতা। এভাবেই তার সাথে বন্ধুত্বের ছাড়াছাড়ি হয়। এই বিচ্ছেদেই তাকে নেশার জগতে টেনে আনে। এরপরও আরেকজনকে ভালোবাসত, কিন্তু বিয়ে করল অন্যকে। কারণ, হিসাবে মেয়েটি বলল”তুমি খুব ইমোশনাল, সংসারের ভার নিতে পারবে না!” শেষে বিয়ে করেছিলেন সুন্দরী এক মেয়েকে। কিন্তু তিন বছর পরেই সে চলে গেল। বলেছিল, *”তুমি শুধু গান শুনে আর কবিতা লিখে সময় কাটাও। আমাকে দেওয়ার মতো সময় তোমার নেই!” তাইতো তার উপলব্ধি সুন্দর মুখ মানুষকে সর্বদাই বঞ্চিত করে।

একসময় ভালো চাকরি ছিল, মন দিয়ে চাকরি করতে না পারাতে, বস একদিন বললেন, *”তপু, তুমি খুব ক্রিয়েটিভ, কিন্তু অফিসে ঘুমাও বেশি! তোমার মত ক্রিয়েটিভ মানুষ যে আমার চলবে না। আমার দরকার কাজের মানুষ। ভালো চাকরি ছিল, ঘরের সুন্দরী স্ত্রী ছিল, ফুটফুটে চাঁদমুখো কন্যা ছিল। আজ আর কিছু নেই।

চাকরি চলে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে দোকান খুললেন। কিন্তু দোকান ভালো চলল না। অবশেষে নানান চিন্তায় স্ট্রোক করে বসলেন। একেবারে মৃত্যুর দুয়ার তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। জীবন ও মৃত তার কাছে দুটোই সমান। এখন এই গোধূলি লগ্নে এসে শুধুই মনে পড়ে কিশোর বেলার সেই স্মৃতি। তবুও তার কোন আক্ষেপ নেই। সে চলে তার মত করে। নিজের মেয়ের মুখটা ছুয়ে দেখতে পারেনি। এই কষ্ট তাকে আর পীড়া দেয় ভীষণভাবে। একদিন সে জানতে পারে, প্রথম পক্ষের মেয়ে বিয়ে করে চলে গেল। শুধু একবার এসেছে”বাবা, তোমাকে শেষবার দেখতে এসেছি! বাবার কোন স্মৃতি তার তেমন মনে পড়ে না এখন তপুর একমাত্র সঙ্গী—সিগারেট। দিনে প্যাকেট, রাতে আরও প্যাকেট। “এটাই আমার শেষ সান্ত্বনা!”

একদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে, তপু আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। নার্স জিজ্ঞেস করল, “কি হাসছেন?” তপু উত্তর দিলেন— “ভাগ্য আমাকে এত কিছু শিখিয়েছে! চাকরি দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে। প্রেম দিয়েছে, ভাঙিয়েছে। স্ত্রী দিয়েছে, ছেড়ে গেছে। এখন শুধু সিগারেটই আমাকে ছাড়ে নি… হে আল্লাহ, আমাকে তুমি সিগারেটখোর থেকে বিড়িখোর বানিও না!” এটাই আমার শেষ ইচ্ছা ”

হাসপাতালের সাদা চাদরে মোড়া তপু আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল। জানালার গ্রিলে বসা চড়াই পাখিটা হয়তো তার যৌবনের কোনো কবিতার লাইন মনে পড়িয়ে দিল। নার্সের চোখে জল এসে গেল – সে জানত না এই হাসি কি কিশোর তপুর প্রথম প্রেমের স্মৃতি, না মধ্যবয়সের ব্যর্থতার বিদ্রূপ, না মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ উপলব্ধি… শুধু জানত, আজ রাতের ডিউটিতে আবার এই রুমেই হয়তো সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।”