ঢাকা ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
ভেড়ামারায় আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে তেল মজুদের অভিযোগ: আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনও’র ‎ নিত্যপণ্যের চড়া দামে দিশেহারা স্বল্প আয়ের মানুষ  সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় তদন্ত ছাড়া মামলা রেকর্ড, হয়রানি শিকার নিরীহ ব্যক্তি: নেপথ্যে এ. এস. আই ফায়াজ প্রান্তিক মানুষের স্বাবলম্বীতা গড়ে তুলতে ব্র্যাকের মানবিক উদ্যোগ জাপানের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ১ ভেড়ামারায় নিঃস্ব দুই পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন  ইউএনও ভেড়ামারায় মৎস্য সংরক্ষণ আইনে অভিযানে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ ও ধ্বংস ২৯ বছরেও নিজস্ব ভবন পায়নি রাজশাহীর সিএমএম আদালত সাংবাদিক সুরুজ আলীর মুক্তিসহ মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা: স্বামী আটক

দৌলতপুরের নীরব বিকেল: উত্তেজনার ছায়ায় এক দাফনের গল্প

দৌলতপুরের নীরব বিকেল: উত্তেজনার ছায়ায় এক দাফনের গল্প

জিল্লুর রহমানঃ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিকেলের আকাশটা ছিল অস্বাভাবিকভাবে থমথমে। দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানের চারপাশে তখন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক উপস্থিতি—পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন। অথচ এমন সময় সাধারণত ভিড় থাকে, কান্না থাকে, থাকে স্বজন-অনুসারীদের ভিড়। কিন্তু সেই দৃশ্য ছিল না।

রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায়, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সম্পন্ন হয় কথিত পীর শামীম রেজার দাফন। জানাজাও ছিল সংক্ষিপ্ত, উপস্থিতিও ছিল সীমিত। দুই-একজন অনুসারী দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে চাননি। যেন ভয়, অস্বস্তি আর অনিশ্চয়তা তাদের ঘিরে রেখেছে।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত কবরস্থানের পথে নেওয়া হয় তাকে। যদিও কিছু অনুসারী তার নিজ আস্তানায় দাফনের দাবি তুলেছিলেন, কিন্তু পরিবার, স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তা সম্ভব হয়নি।

দাফনের পরও এলাকায় স্বাভাবিকতা ফেরেনি পুরোপুরি। শামীম রেজার আস্তানাটি এখন ধ্বংসস্তূপ—ভাঙা আসবাবপত্র, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাদ্যযন্ত্র, আর পোড়া চিহ্ন যেন ঘটনার ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।

ঘটনার পর থেকেই এলাকাজুড়ে চাপা উত্তেজনা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত একটি ভিডিওকে ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই তা ক্ষোভে রূপ নেয়।

শনিবার দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা ফিলিপনগরের আবেদের ঘাটে জড়ো হয়ে মিছিল বের করে। পরে তারা শামীমের আস্তানায় হামলা চালায়।

তাকে দোতলার কক্ষ থেকে টেনে-হেঁচড়ে নামানো হয়। এরপর চলে নির্মম মারধর ও কুপিয়ে জখম করা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ সময় হামলাকারীরা আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে। অন্তত ৭ জন ভক্ত, যার মধ্যে নারীও ছিলেন, আহত হন।

ঘটনার পর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

পুলিশ জানায়, জনতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে আস্তানা গড়ে তোলেন। নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

এর আগে তিনি পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরে সেই জীবন ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় মন দেন।

তবে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২১ সালে একটি শিশুর দাফনে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

দৌলতপুরের এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে একটি পুরনো প্রশ্ন—অভিযোগ যাই হোক, বিচার কি জনতার হাতে হওয়া উচিত?

সেদিনের বিকেলে কবরস্থানে যেমন ছিল না ভক্তদের ভিড়, তেমনি ছিল না কোনো সান্ত্বনার ভাষা। ছিল শুধু নীরবতা, আর এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ভেড়ামারায় আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে তেল মজুদের অভিযোগ: আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনও’র ‎

দৌলতপুরের নীরব বিকেল: উত্তেজনার ছায়ায় এক দাফনের গল্প

আপডেট টাইম : ০৯:০৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

দৌলতপুরের নীরব বিকেল: উত্তেজনার ছায়ায় এক দাফনের গল্প

জিল্লুর রহমানঃ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিকেলের আকাশটা ছিল অস্বাভাবিকভাবে থমথমে। দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানের চারপাশে তখন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক উপস্থিতি—পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন। অথচ এমন সময় সাধারণত ভিড় থাকে, কান্না থাকে, থাকে স্বজন-অনুসারীদের ভিড়। কিন্তু সেই দৃশ্য ছিল না।

রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায়, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সম্পন্ন হয় কথিত পীর শামীম রেজার দাফন। জানাজাও ছিল সংক্ষিপ্ত, উপস্থিতিও ছিল সীমিত। দুই-একজন অনুসারী দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে চাননি। যেন ভয়, অস্বস্তি আর অনিশ্চয়তা তাদের ঘিরে রেখেছে।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত কবরস্থানের পথে নেওয়া হয় তাকে। যদিও কিছু অনুসারী তার নিজ আস্তানায় দাফনের দাবি তুলেছিলেন, কিন্তু পরিবার, স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তা সম্ভব হয়নি।

দাফনের পরও এলাকায় স্বাভাবিকতা ফেরেনি পুরোপুরি। শামীম রেজার আস্তানাটি এখন ধ্বংসস্তূপ—ভাঙা আসবাবপত্র, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাদ্যযন্ত্র, আর পোড়া চিহ্ন যেন ঘটনার ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।

ঘটনার পর থেকেই এলাকাজুড়ে চাপা উত্তেজনা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত একটি ভিডিওকে ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই তা ক্ষোভে রূপ নেয়।

শনিবার দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা ফিলিপনগরের আবেদের ঘাটে জড়ো হয়ে মিছিল বের করে। পরে তারা শামীমের আস্তানায় হামলা চালায়।

তাকে দোতলার কক্ষ থেকে টেনে-হেঁচড়ে নামানো হয়। এরপর চলে নির্মম মারধর ও কুপিয়ে জখম করা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ সময় হামলাকারীরা আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে। অন্তত ৭ জন ভক্ত, যার মধ্যে নারীও ছিলেন, আহত হন।

ঘটনার পর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

পুলিশ জানায়, জনতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে আস্তানা গড়ে তোলেন। নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

এর আগে তিনি পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরে সেই জীবন ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় মন দেন।

তবে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২১ সালে একটি শিশুর দাফনে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

দৌলতপুরের এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে একটি পুরনো প্রশ্ন—অভিযোগ যাই হোক, বিচার কি জনতার হাতে হওয়া উচিত?

সেদিনের বিকেলে কবরস্থানে যেমন ছিল না ভক্তদের ভিড়, তেমনি ছিল না কোনো সান্ত্বনার ভাষা। ছিল শুধু নীরবতা, আর এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি।